সেই মেটলাইফেই আবারও চোখ ভিজল মেসির
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২০-০৭-২০২৬ ১১:২৬:০৩ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
২০-০৭-২০২৬ ১১:২৬:০৩ পূর্বাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম যেন লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর এক নীরব সাক্ষী। এক দশক আগে এই মাঠেই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর অশ্রুসিক্ত চোখে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ঠিক ১০ বছর পর আবারও একই স্টেডিয়ামে চোখে জল নিয়ে মাঠ ছাড়লেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। তবে এবার কান্নার কারণ শুধু হার নয়; এটি ছিল এক পূর্ণতা পাওয়া কিংবদন্তির শেষ বড় স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাওয়ার বেদনাও।
মেটলাইফে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাস গড়ার আরেকটি সুযোগ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। ফাইনালে পৌঁছানোর পথে তার পারফরম্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছিল এক দশক আগের সেই দুর্বার মেসিকে। গোল করেছেন, করিয়েছেনও। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বারবার তৈরি করেছেন সুযোগ। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে স্পেনের কৌশলী ফুটবলের সামনে যেন হারিয়ে গেলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। পুরো ম্যাচজুড়ে তাকে কঠোর নজরদারিতে রেখেছিল প্রতিপক্ষ। শেষ পর্যন্ত আর জেতা হলো না আরেকটি বিশ্বকাপ।
এই পরাজয়ের সঙ্গে ফিরে এসেছে মেটলাইফের পুরোনো স্মৃতি। ২০১৬ সালের ২৬ জুন কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। সেই ব্যর্থতায় শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে হতাশায় ভেঙে পড়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। বলেছিলেন, দেশের হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বড় শিরোপা জেতা যেন তার ভাগ্যে নেই।
তার আগেও ২০১৪ বিশ্বকাপ ও ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের তীব্র যন্ত্রণা সইতে হয়েছিল মেসিকে। টানা তিনটি বড় ফাইনালে ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল আর্জেন্টিনায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তার নেতৃত্ব, এমনকি দেশের প্রতি তার নিবেদন নিয়েও। সেই মানসিক চাপ, হতাশা আর অপমানই শেষ পর্যন্ত মেটলাইফের সেই রাতে তাকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।
কিন্তু মেসির গল্প সেখানেই থেমে থাকেনি। কয়েক মাস পর সতীর্থদের অনুরোধ, সমর্থকদের ভালোবাসা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় দলে ফিরে আসেন তিনি। এরপর যেন পাল্টে যায় সবকিছু। ২০২১ সালে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপাখরা ঘুচিয়ে জেতেন কোপা আমেরিকা।
এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ, ফিনালিসিমা এবং ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা জিতে জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অধিনায়কদের একজন হয়ে ওঠেন। ক্লাব ও দেশের হয়ে সব মিলিয়ে ৪৮টি শিরোপা জিতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
তবু সব অর্জনের পরও এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল বিশেষ। কারণ, এটি ছিল মেসির সামনে আরেকটি অনন্য ইতিহাস লেখার সুযোগ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আবারও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর ১৯৯০ সালেও ফাইনালে তুলেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা।
মেসিও সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করলেন। তবে শেষ ধাপটি আর পেরোনো হলো না। বিশ্বকাপ জিততে পারলে হয়তো সর্বকালের সেরা আর্জেন্টাইন ফুটবলার নিয়ে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হতো। কিন্তু পরাজয়ের ফলে ম্যারাডোনা ও মেসি দুই কিংবদন্তিই যেন নিজেদের জায়গায় সমান উচ্চতায় থেকে গেলেন।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সঙ্গে অবশ্য শুধু বেদনার স্মৃতিই জড়িয়ে নেই। ২০১২ সালে এই মাঠেই ব্রাজিলের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেছিলেন মেসি। সেদিন ৪-৩ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সব মিলিয়ে এই স্টেডিয়ামে পাঁচটি ম্যাচ খেলে চারটি গোল করেছেন তিনি। তাই মেটলাইফ তার কাছে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার প্রতীক।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়েও চলছে আলোচনা। তিনি এখনো অবসরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তবে বয়স, অর্জন এবং সময় সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার প্রতিটি ম্যাচই এখন আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। তাই মেটলাইফে তার চোখের জল শুধু একটি ফাইনাল হারার হতাশা নয়, বরং একটি অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের আবেগও হয়ে উঠেছে।
ফুটবল সবসময় সব গল্পকে নিখুঁত সমাপ্তি দেয় না। মেসির জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। যে মাঠ একসময় তাকে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, সেই একই মাঠে এক দশক পর ফিরে এলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, দুইবারের কোপা আমেরিকা জয়ী এবং ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার হিসেবে। এবারও চোখ ভিজল তার।
তবে সেই অশ্রুর পাশে ছিল না ব্যর্থতার শূন্যতা; ছিল অর্জনের পূর্ণতা, আর শেষ স্বপ্নটি অধরা থেকে যাওয়ার মানবিক আক্ষেপ। সেই কারণেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম হয়তো চিরকাল লিওনেল মেসির জীবনের সবচেয়ে আবেগময় ঠিকানাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স